সাধক কবি আছিম শাহ্’র 'জীবন কথা ৩৬০আউলিয়ার স্মৃতিধন্য আধ্যাত্মিক ভূমি বৃহত্তর সিলেটের
জেলার সুনামগঞ্জ লোকসাহিত্য সমৃদ্ধ উপজেলা বাংলার
হচ্ছে সাহিত্যের জগন্নাথপুর। মরমী অব্যাহত ধারায় এ উপজেলার অবদান অপরিসীম।
সারাদেশের মতো জগন্নাথপুরের বুকেও
সাধক-সন্ন্যাসী জন্ম বহু পীর-দরবেশ সাধু- বাণীর মাধ্যমেই এদেশকে পূণ্যভূমিতে গ্রহণ করেছেন এবং
পরিণত করেছেন। সুফী সাধকগণ তাদের স্ব স্ব ধারায় মরমী সাহিত্যের প্রচুর সম্পদ রেখে গেছেন যা গবেষণার বিষয় হয়ে রয়েছে। তারা চিত্তবৃত্তির এই সুরময় ভূবনে পদচারণা করে নিজস্ব সৃষ্টিধারায় মরমী সাহিত্য যে অমিয় প্রবাহ বইয়ে দিয়েছিলেন। তা আজো দেশের মাটি ও বাতাসে অপূর্ব ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে চলেছে। উপমহাদেশের আধ্যাত্মিকতা বা মরমী সাধনার মূল কেন্দ্র বিন্দুর স্রোতধারা যদিও বাংলা এবং ভারতের বাইরে জন্মলাভ করেছে; কিন্তু পরবর্তীকালে এ সুফীধারা ও মরমীবাদ বাংলার উধর শ্যামল জমিনে আশ্চর্যজনকভাবে বিকাশ লাভ করেছে।
সুফী সাধক সৈয়দ শাহ হুছন আলম, মরমী কবি আসহর আলী। চৌধুরী, সৈয়দ শাহনূর, বাউল সাধক রাধারমণ দত্ত, সুফি সাধক শাহ্ আছিম আলী, মুন্সী রহমত উল্লা, কালু শাহ্ প্রমুখ সাধক কবিদের মাধ্যমে।
আউল-বাউলের বিচরণ ভূমি এ জগন্নাথপুরের মাটি ও মানুষের লোহিত কণায় এঁদের গান আজ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম সঙ্গী ৮ আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত জগন্নাথপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন সুফী সাধক মরমী সাধক কবি আছিম শাহ্ পল্লী বাংলার অন্যতম সমৃদ্ধ সংস্কৃতির পীঠস্থান এ জনপদে জন্মগ্রহণ করে মরমী কবি আছিম শাহ্ এ অঞ্চলের মানুষের চিত্তজগতকে করেছে জাগ্রত ও আন্দোলিত। তার মহান সাধনায় রচিত বিভিন্ন ধারা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গীত যুগ যুগ ধরে বৃহত্তর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গীত হয়ে আসছে। সদা সর্বদা নারী-পুরুষ-আবাল-বৃদ্ধ মরমী সাধকের গানগুলোর মর্মবাণী ও সঙ্গীত সুধা আকণ্ঠ পান করে আসছে। তার সঙ্গীত যেমন :
“সাধের মানুষ জনম আর হবে না, দিন গেলে কি পাবে দিন গেলে কি পাবে রে মন, সময় গেলে কি হবে'র” মতো গানগুলো
যেকোন ভাবুক হৃদয়কে জীবনের মৃত্যু এবং ক্ষণস্থায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ করে জগন্নাথপুর পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্র জগন্নাথপুর গ্রামে সাধক কবি আছিম শাহ্'র জন্ম ২৬ আশ্বিন ১২৫০ বঙ্গাব্দ। পিতার নাম: শাহ্ বদর উদ্দিন মুন্সী। তিনি আলিম ও হেকিম শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। তিনি সৈয়দ শাহনূরের অন্যতম খলিফা পীর শাহ্জুর মনির সাহচর্য লাভ করেন। তার কাছ থেকে ফকির সাধনার নানাদিক সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। ভক্তবৃন্দের অনুরাগের কারণে তিনি নিজগ্রামে একটি মোকাম প্রতিষ্ঠা করেন। তার নামানুসারেই গ্রামের নাম রাখা হয় আছিম নগর। আছিম শাহ্ পিতার সাহচর্যে থেকে মাদ্রাসিকায় জামাতে উলা পাশ করেন। যা বর্তমানে ফাজিল এর সমতুল্য। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন সদালাপী ও বিনয়ী প্রকৃতির। শিক্ষাজীবন পেরিয়ে তিনি গ্রামেই ছাতকের একটি মসজিদে ইমামতি শুরু করে ১০-১২ বছর সেখানে অবস্থান করেন।
এদের মধ্য শারফিন শাহ্ (রঃ) ও ছিলেন। তিনি এ সময় স্বীয় মোকামে অবস্থানের নির্দেশ দিয়ে বলেন, তৎকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের অভয়ালয় কালীবাড়ির পূর্বে শাহ্ মাদীর সাহেবের মোকাম রয়েছে। সেখানে তাকে আসন স্থাপনের কথা বলেন। আছিম শাহ্ শারফিন শাহ্'র নির্দেশ অনুযায়ী ফিরে আসেন । এ সময় তিনি নিঃসন্তান প্রচুর সম্পত্তির মালিক মদন রায় চৌধুরীর স্নেহ সাহচর্যে আসেন। মদন রায় চৌধুরী আছিম শাহকে বিপুল পরিমাণ ভূমিদান করলে পরবর্তীতে তার নামানুসারেই আছিম নগরের নামকরণ করা হয়। আছিম শাহ'র ছেলে শাহ্ বশির আলী, শাহ্ খাতিম আলী ।
মেয়ে মুজেস্বর খাতুন ও মুফিজুন নেছা পর্যায়ক্রমে এদের সকলের মৃত্যু ঘটে। তাদের বংশানুক্রমে হচ্ছে শাহ্ বশির আলীর ছেলে শাহ্ জুনুম আলী, মধ্য শাহ্ বন্দে আলী মাষ্টার, শাহ্ সুন্দর আলী, শাহ্ কলমদর আলী, শাহ্ নজির আলী, শাহ্ মনোহর আলী। মেয়ে চন্দ্রবান বিবি এবং সূর্যবান বিবি। আছিম শাহ'র দ্বিতীয় পুত্র খাতিম আলী'র প্রথম পুত্র শাহ্ মুক্তার আলী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে গিয়েই তিনি শহীদ হন এবং এক মেয়ে মায়া বিবিও বেঁচে নেই।
এই মহান সাধক কবি আছিম শাহ্ ১৩৫৩ বঙ্গাব্দের ২৬ আশ্বিন মৃত্যুবরণ করেন।
আছিম শাহ যেভাবে অলির সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন : একদিন এক ফকির সাহেব আছিম শাহকে ডেকে বলেন, বাবা তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও। তুমি যে উদ্দেশ্যে আমার নিকট এসেছো, যে প্রশ্ন করতে এসেছো তা পূর্ণ করার জন্য সৈয়দ সানুর সাহেবের ভক্ত সাজুর তোমার উদ্দেশ্য ঘোরাফেরা করছেন।
তার কাছে তোমার বাসনা ব্যক্ত করলে দয়াময় খোদা তা'য়ালা মনের বাসনা পূর্ণ করবেন। তিনি বাড়ি ফিরে এসে দেখেন সত্যিই ওলী সাজুর জগন্নাথপুর গ্রামে এসে পাগলের মতো খোঁজছেন। আছিম শাহ তাকে অন্তরের বাসনার কথা ব্যক্ত করলেন। তার প্রশ্নের জবাব উক্ত ফকিরের নিকট পাওয়া গেল। তখন পিতা-মাতার হুকুম নিয়ে উক্ত ফকির সাজুর সাহেবের নিকট মুরিদ হলেন। কিছুদিন পর পীরের খেদমত থেকে
আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের পর পীরের আদেশে শারফিন সাহেবের মোকাম দর্শনে চলে যান। সেখান থেকে হুকুম হলে তিনি গ্রামে চলে যান। সেখানে গ্রামের পূর্বাংশে জঙ্গলের ভিতর শাহ্ মাদার সাহেবের মোকাম আছে সেখানে চলে যাও । একজন প্রবীণ বৃদ্ধ স্বপ্নযুগে দেখে আছিম শাহকে শাহ্ মাদার মোকাম দেখিয়ে দেন । এভাবেই তিনি সান্নিধ্যে আসেন । আছিম শাহ্ অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছেন তার মধ্য একটি
হচ্ছে, যেমন কথিত আছে পিতার মুদির দোকানে তিনি মনোনিবেশ করেন। সততা, ন্যায়, নিষ্ঠার বাজারে এবং টানাখালি বাজারে মালামাল বিক্রি করতে থাকেন । তিনি নিকটস্থ রসূলগঞ্জ বাজারে এবং টানাখালি বাজারে মালামাল বিক্রি করতেন। তার সততার পরিচয় পেয়ে গ্রাহকরা এমনভাবে ভিড় করে মালামাল খরিদ করতো যে মেপে দিয়ে পয়সা নেয়ার সুযোগ পাওয়া যেতনা। আছিম শাহ্ এমন ছিলেন যে, মেপে বিক্রি করতে করতে তিনি হাতের আন্দাজে দ্রব্য দিতে শুরু করেন। গ্রাহকরা অন্যত্র নিয়ে গিয়ে মেপে সবকিছু একেবারে সঠিক পেতেন। এহেন কার্যকলাপে গ্রাহকরা তাকে সাধু মহাজন বলে আখ্যায়িত করত। এখানে তার সততা, নিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়। আরও অলৌকিক ঘটনা আছে সেগুলো জানা যায়নি।
#রুকনশাহবাউলমেলা
%20(1).jpg)
1 মন্তব্যসমূহ
আলহামদুলিল্লাহ
উত্তরমুছুন