মরমী সাধক কবি শাহ্ সুন্দর আলী 'র (রহ) জীবন কথা



মরমী সাধক কবি
শাহ্ সুন্দর আলী’র জীবন কথা

আবহমান গ্রাম বাংলার সবুজ শ্যামল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যেভরা লীলাভূমি সাহিত্য
সুনামগঞ্জ জেলা লোক মরমী সঙ্গীতের অফুরন্ত এক ভাণ্ডার। আর এই সমৃদ্ধ জনপদের অন্যতম উপজেলা হচ্ছে জগন্নাথপুর ৩৬০ আউলিয়ার সফর সঙ্গী ৮ আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত
নলজুর, কুশিয়ারা,মাগুড়া,বিবিয়ানা বিধৌত হিজল করা
নলুয়া,বেষ্টিত,মইয়ার হাওরের প্রাকৃতিক মহিমায়

উদ্বেলিত সৃজনশীল সুফি সাধক, বাউল, কবিগণ সুপ্রাচীনকাল থেকেই সমৃদ্ধ। এরা জারী, সারি, মারফতি, ধামাইল, মালজোরা প্রভৃতি মরমী সঙ্গীতের মাধ্যমে এ উপজেলাকে সমৃদ্ধ রেখেছেন। ফলে রেনেলের মানচিত্রেও (১৭৭৮) জগন্নাথপুর উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়েছিল। রাধা রমণের মতো গুণী বাউল সাধকের দু'হাজার গান রচনা করে ইতিহাসে মরমী সাহিত্য এক কালজয়ী সাধক হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। তার সুর সঙ্গীতের অনবদ্য সৃষ্টি আজ আমাদের গৌরব ও প্রেরণার উৎস। সাধক শাহ্ আছিম আলী (রহ) ও এ উপজেলার একজন জনপ্রিয় মরমী সাধক। আর এই শাহ্ আছিম আলী'র সুযোগ্য উত্তরসূরী শাহ্ সুন্দর আলী মরমী সাহিত্যের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। শাহ সুন্দর আলী ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে জগন্নাথপুর উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শাহ বশির আলী এবং মাতার নাম মোছাঃ রুপজান বিবি। শাহ্ বশির আলীর ছয় ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে শাহ সুন্দর আলী ছিলেন তৃতীয়। শাহ সুন্দর আলী'র পূর্ব-পুরুষ এর আদিনিবাস ছিলো সিলেটের বাগের কলায়। কথিত রয়েছে শাহ্ সুন্দর আলী'র পিতামহ শাহ্ আছিম আলী স্বপ্নযোগে জগন্নাথপুর এসে জগন্নাথপুরের হিন্দু ধর্মানুরাগী মধন রায় চৌধুরীর দান করা ভূমিতে শাহ্ শামাদারের আসন স্থান করে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। সেই থেকে একজন সাধক পীর হিসেবে অত্র অঞ্চলে তথা সারা দেশে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। শাহ্ সুন্দর আলী এই আছিম শাহ্'র একজন সুযোগ্য উত্তরসূরী। শাহ সুন্দর আলী ছোটবেলা থেকেই একজন নম্র, ভদ্র ও শান্ত প্রকৃতির ধর্মানুরাগী লোক ছিলেন । তিনি স্কুল, মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও শিক্ষার প্রতি ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। সামান্য সময় পেলেই বইখাতা নিয়ে পড়তে বসতেন। আর লিখতেন বিভিন্ন ভাবের গান। শাহ্ সুন্দর আলীকে তার দাদা শাহ্ আছিম আলী খুব ভালবাসতেন। আর এ ভালবাসার কারণে তিনি আহিম আলী দাদার সংস্পর্শে সব সময় থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। শাহ সুন্দর আলী কিশোর বয়সেই দাদা শাহ্ আছিম আলী পীরের কাছ থেকে শিষ্যত্ব পদ গ্রহণ করেন।

কতিথ রয়েছে, সে সময় শাহ্ সুন্দর আলী স্বপ্নযোগে দেখেন লম্বা চুলের জটা হতে লাঠি ও গলায় রয়েছে পাথরের মালা পরা এক পীর এসে বলছেন। হে সুন্দর আলী তুমি আর বিলম্ব না করে তোমার দাদা শাহ্ আছিম আলী পীরের কাছে মুরিদ হয়ে যাও। ঘুম ভাঙ্গার পর শাহ্ সুন্দর আলী স্বপ্নের কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েন ।

এ সময়ে ভাবে বিভোর হয়ে তিনি যে গান রচনা করলেন সেই গানটির প্রথম অংশ-
 "ওমন গুরু ভজরে মন দুরাচার গুরু বিণে এ সংসারে বন্দু নাই তোমার...."

এ সময়ে দাদা শাহ্ আছিম আলী'র নাতি সুন্দর আলীকে ডেকে বলেন আর দেরী নয় অজু পড়ে এসো সাথে সাথেই তিনি পরিবারের সকলের উপস্থিতিতে তাকে মুরিদ করে নেন। এভাবে চলতে থাকে দাদা-নাতির সু-মধুর সম্পর্ক। হঠাৎ একদিন রাতে দাদা শাহ্ আছিম আলী সুন্দর আলীকে ডেকে বলেন, তুমি তো অনেক সুন্দর সুন্দর গান লিখেছ আমাকে একটি গান গেয়ে শোনাও। দাদার কথায় তিনি তার লেখা এ গানটি শুনান

"প্রাণনাথ বন্দুয়া আমার

রইলো কার বাসরে গো সখি

সখি আমার বন্দু আইনা দে...' গানটি শোনার পর পীর আছিম আলী চিন্তিত হয়ে পড়েন পরদিন তিনি তার শিষ্যের বাড়ী যাওয়ার জন্যে সুন্দর আলী সহ কয়েকজনকে সাথে নিয়ে নৌকাযোগে রওনা হন, নৌকাটি দিরাই উপজেলার ধল গ্রামের শিষ্য চেরাগ আলীর বাড়ির ঘাটে থামানো হয় এবং আছিম পীরের প্রস্তাবে ঐ বাড়ীর কন্যা ফাতেমা নেছার সাথে শাহ্ সুন্দর আলী'র বিবাহকার্য সম্পন্ন হয়।

১৩৫৩ বাংলার ২৩ আশ্বিন সাধক কবি আছিম শাহ্ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর মাজারের দেখাশুনা থেকে শুরু করে মাজারের সার্বিক দায়িত্ব শাহ্ সুন্দর আলী নিজেই পালন করেন। শাহ্ সুন্দর আলী প্রচলিত নিয়ম সংসার জীবনে প্রবেশ করলেও সংসারের প্রতি পুরোপুরি মনোযোগী হতে পারেননি। অবশ্য সংসারের দায়িত্ব নিয়ে তিনি জগন্নাথপুর বাজারে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান খুলেছিলেন কিন্তু তার মন পড়ে থাকতো অন্য জগতে। তাই আস্তে আস্তে তারই পূর্ব-পুরুষ আছিম আলী'র পদাঙ্ক অনুসরণ করে আধ্যত্বিক জগতে ডুবে যেতে থাকে। এদিকে মাজারের দেখাশুনা অন্যদিকে নিজেও অনেক আধ্যাত্বিক গান রচনায়

নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তার অনেক অলৌকিক কাহিনী লোকমুখে শোনা যায়। জীবিত অবস্থায় তিনি অনেক কেরামতি দেখাইয়াছে। যা তার স্ত্রী ফাতেমুন নেছার অনিচ্ছায় প্রকাশ করা গেল না। তিনি নিগুঢ় তত্ত্ব, দেহ তত্ত্ব ও পরম তত্ত্ব, বিরহ বিচ্ছেদ সবমিলিয়ে তার গানের সংখ্যা প্রায় পাঁচশতাধিক হবে সংরক্ষনের অভাবে তার অনেকগুলো গান ইতিপূর্বে কোথাও প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা যায়নি। শুধু জগন্নাথপুর উপজেলার ইকড়চই গ্রামের শিল্পী বাবুল শাহ্ দুই ক্যাসেটে সুন্দর আলী শাহ'র গান গেয়েছেন এবং ইসহাকপুর গ্রামের শিল্পী আব্দুস সালামও একটি ক্যাসেট করেছেন। এছাড়াও এই প্রতিবেদনের লেখক শাহ্ সুন্দর আলীকে নিয়ে একটি তথ্য ভিত্তিক প্রতিবেদন লিখেছেন সিলেটের স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় ২০০৩ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত হয়।

তার গানগুলো কখনও বই আকারে প্রকাশিত হয়নি। শাহ্ সুন্দর আলী বেঁচে থাকা কালেই তার অনেক ভক্ত আশেকান তৈরী হয়। তার মৃত্যুর ৬মাস পূর্বে তিনি নিজেই মাজার তৈরী করে গিয়েছিলেন। সেই মাজারের তার ভক্ত আশেকানরা তার গান গেয়ে মাজার প্রাঙ্গণ মুখরিত করে তুলতো। এছাড়াও প্রতি বছর তার পিতামহ আছিম শাহ্'র যে ওরস পালিত হতো এবং আজও হচ্ছে সেই ওরসের মধ্যমণি হয়ে থাকতেন। শাহ্ সুন্দর আলী তিনি ২০০২ সালের ১৫ই জুলাই ১০৩ বছর বয়সে ঘুম থেকে তার পরিজনদের ডেকে তাদের সঙ্গে খোশালাপে মত্ত হয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে সকাল ৬টায় হাসিমুখে ইহজগৎ ত্যাগ করেন। মৃত্যুর একদিন পূর্বে অকুল নদীর ঢেউ ভাব মিশ্রিত গানটি রচনা করেন

শুভেচ্ছান্ত >

শাহ মুহাম্মদ রুকন শাহ  

আছিম নগর দরগা শরীফ জগন্নাথপুর সুনামগঞ্জ 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ